ইস্তেগফার এর তিনটি রুহানি উপকারিতা

12:52:00 PM

ইস্তেগফার একজন মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির অন্যতম আশ্চর্যজনক উপায়। কারন আমরা সবাই গুনাগার, এমন কেউই আমাদের মাঝে নেই যে দাবী করতে পারে যে সে জীবনে কোন গুনা করে নাই। ‌ 

কিন্তু এই গুনাহ হতে বাচার জন্য মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে তাওবা নামক এক অনন্য নেয়ামত দান করেছেন। একজন মুসলিম যত গুনাই করুক না কেন, তাওবার মাধ্যমে সে একেবারে নিষ্পাপ হয়ে আল্লাহর কাছে যাবার সুযোগ পেয়ে থাকে।

আগেই বলেছি, তওবা একজনের জন্য অনেক বড় নেয়ামত, মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে একটি উপহার। তাওবার মাধ্যমেই আমরা আমাদের আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে পারি। 

যখনই কোনো ভুল আমরা করে ফেলি বা কোন সীমানা আমরা অতিক্রম করে ফেলি তখনি তওবার মাধ্যমে আমরা পুনরায় আল্লার দরবারে নিজেদেরকে পরিবেশন করতে পারি।

তাই একজন মুসলিমের উচিত যখনই সে কোন গুনা করে ফেলে হোক ছোট বা বড়, সঙ্গে সঙ্গেই সে আল্লার কাছে ইস্তেগফার করে তওবা করে ফিরে আসবে। এমন কি যদি মনে হয় যে কোন গুনাহতো করিনি, তারপরও মহান আল্লাহর কাছে বেশী বেশী তওবা করা উচিত। কারন আমরা মানুষ কখনোই জানিনা আমাদের মনের অজান্তে কি কি গুনাহ হয়ে গিয়েছে।

একজন মুমিনের জন্য ইস্তেগফার এর ফজিলত অনেক বেশি। নিচে এরকম তিনটি প্রধান রুহানি ফজিলত বর্ণনা করা হলো:

আমাদের আমল নামা থেকে সমস্ত গুনাহ্ পরিষ্কার করে ধুয়ে ফেলে



আমরা যখন কোন গুনাহ করে ফেলি তখন সেটা আমাদের আমলনামায় লেখা হয়। এই গুনাহ আমাদের সৎকাজ গুলিকে খেয়ে ফেলে। যখন আমলনামা মিযানের পাল্লায় মাপা হবে তখন এই গুনা গুলোই মিজানের পাল্লার বামপাশে ভারী করে দিবে। 

আল-কুরআনে এসেছে যদি মিজানের পাল্লার বামপাশ অর্থাৎ গুনাহের পাস যদি বেশি ভারী হয় তাহলে সে ব্যক্তি আখিরাতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

আর এই বদ আমলের কারণে যে আমলনামা ভারী হয় সেটা দূর করার একটাই উপায়, তাহলে মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে তওবা। তওবার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে ফিরে আসে এবং ভবিষ্যতে সেই পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। এবং আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু এবং ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। 

নারী বা পুরুষ যে কোন বান্দার তওবার কারণে তার গুনা অবশ্যই মাফ হয়।

আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

" মহান আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদেরকে ডাক দিয়ে বলেন, ওহে আদম সন্তান, যতক্ষণ তুমি আমার কাছে মাফ চাবে এবং আমার রহমতের আশা করবে আমি তোমাকে মাফ করব, যত বড় গুনাহ তুমি করো না কেন। হে আদম সন্তান, তোমার গুনাহ যদি বাড়তে বাড়তে আসমান পরিমানও হয় এবং তুমি আমার কাছে মাফ চাও তবুও আমি তোমাকে মাফ করব। এজন্য আমি কোনকিছুরই পরোয়া করবো না। হে আদম সন্তান তুমি যদি পৃথিবী সমান পরিমান গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আসো এবং আমার সাথে কারো শরিক না করে থাকো, তবে আমি দুনিয়া পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে আসব।" তিরমিজি।

একজন বান্দা যখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় সে তার আমলনামা গুনাহ থেকে পরিষ্কার করতেই থাকে। এবং আমাদের মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ তা'আলা ওয়াদা করেছেন, যতক্ষণ বান্দা আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে মাফ চাবে, আল্লাহ অবশ্যই মাফ করবেন।

গুনাহের ক্ষেত্রে শয়তান আমাদেরকে সবসময়ই একটা সূক্ষ্ম ধোঁকায় ফেলে। সে বলতে চায়, তোমার গুনা তো অনেক বেশি, এত গুনাহ কি আল্লাহ আলা মাফ করবেন? কাজেই তওবা করে কি লাভ। 

এরকম ওয়াসওয়াসার কারণে বান্দা যখন হতাশ হয়ে যায়, সে আরো বেশি করে গুনাহ করতে থাকে।
একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের কখনোই শয়তানের এরকম ফাঁদে পড়া যাবে না। শুধু ইস্তেগফার, শুধুই তওবা। আন্তরিক তওবা করলে মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে অর্থাৎ তাঁর বান্দাদেরকে অবশ্যই মাফ করবেন।

আমাদের নবী সাঃ বলেছেন, 
"সুসংবাদ তাদের জন্যই যাদের আমল নামায় অনেক বেশি পরিমাণ তওবা ইস্তেগফার পাওয়া যাবে।" সুনানে ইবনে মাজাহ।

তওবা বান্দাকে মহান আল্লাহতালার নিকটবর্তী করে


গুনাহের পর অনুতপ্ত হওয়া, বিরক্ত হও লজ্জিত হওয়া এগুলো ভালো লক্ষণ। অন্তরে এরকম অবস্থা সৃষ্টি হওয়া মানেই হলো বান্দা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সচেতন, যদিও সে সীমা অতিক্রম করেছে অর্থাৎ গুনাহ করে ফেলেছে।

বান্দার উচিত তার অন্তরে এরকম ভয় লজ্জা আফসোস অনুভূতি থাকা অবস্থাতে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাওয়া। এর ফলে তওবা খাটি তওবার মত হবে। আর যখন তওবা খাটি হয়, আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা মাফ করবেন।

বান্দা যত বেশী তওবা করবে, সে তত মহান আল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছে যাবে, ততই মহান আল্লাহর বড়ত্ব সম্পর্কে ধারনা হবে। ফলে পরবর্তীতে যতই গুনাহ করে ফেলবে বান্দা, আরো বেশি বেশি সে তওবার দিকে ধাবিত হবে।

গুনাহের পর তওবা হয়ে গেলে এরপর সেই গুনাহের কাফফারা স্বরূপ নেক কাজ করে নিতে হবে। এর ফলে আমলনামায় গুনাহের কারণে যে দাগ পরেছিল, নেক কাজ করা দ্বারা সেই দাগ প্রতিস্থাপিত হয়ে যাবে।

তওবা দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কি স্বস্তি দান করে



যখন বান্দা কোন গুনাহ করে ফেলে তখন তার অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। হতে পারে কোন গীবত করে ফেলার কারণে, হতে পারে কাউকে কটু কথা বলার কারণে ও।

অন্তরে এরকম অবস্থা সৃষ্টি হলে ইস্তেগফার সেই অন্তরকে স্বস্তি দিতে পারে। ইস্তেগফার করার পর অনেক হালকা বোধ হবে এবং মহান আল্লাহ তাআলার ইবাদতে নিমগ্ন হতে মন চাইবে।

ইস্তেগফার এর নিমিত্তে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু দুয়া



হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে আমাদের মহানবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনে শতাধিকবার তওবা করতেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে তিনি সত্তর বারের অধিক তওবা করতেন।

রাসূল সাল্লাহু সালাম যদি দিনে ১০০ বার তওবা করে থাকতেন, তাহলে আমাদের কি করা উচিত? অন্ততপক্ষে ১০০ বার এর নিচে তো উচিতই না। রাসুলের শেখানো দোয়ার মাধ্যমে আমরা এই ইস্তেগফার গুলো করতে পারি। 

আব্দুল্লাহ বিন আমর হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ তাআলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, 
" হে রাসূল সাল্লাহু সালাম নামাজের ভিতরে বলার মত একটা দুআ আমাকে শিখিয়ে দিন। রাসুল সাঃ বললেন, তুমি বলবে হে আল্লাহ আমি আমার নিজের উপর জুলুম করেছি অনেক, এবং আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। অতএব আপনি আপনার ক্ষমাশীলতার উসিলায় আমাকে মাফ কর দিন। এবং আমার উপর রহম করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। " (আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাছীরও ওয়ালা ইয়াগফিরু যুনূবা ইল্লা আনতা ফাগফিরলী মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা ওয়ার হামনী ইন্না কা আনতাল গাফুরুর রাহীম।)

اللهم إنك عفو تحب العفو فاعفُ عني‏

“(হে আল্লাহ আপনি পরম ক্ষমাশীল আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন).” (রিয়াদুস সালেহীন)


সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এরকম আরো অনেক দোয়া আছে যার মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাইতে পারি। ইস্তেগফার এর সবচাইতে ছোট যে দোয়া সেটি হলো আস্তাগফিরুল্লাহ। শুধুমাত্র আস্তাগফিরুল্লাহ জিকির করার মাধ্যমে আমরা ক্রমাগত মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ইস্তেগফার করতে পারি।

তবে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে আমরা মুসলমানরা সবসময়ই গুনাহর মধ্যে আছি। আর মহান আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে ইস্তেগফারের নেয়ামত দান করার মাধ্যমে গুনা থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। ইস্তেগফার এর মাধ্যমে আমরা আমাদের রবের কাছে ফিরে আসতে পারি।

শেয়ার করতে ভুলবেন না/ আপনিও পেতে সওয়াব।

No comments:

Powered by Blogger.